গল্প :অপরাজিতা
লেখিকা :নীহারিকা নিরু (ছদ্মনাম )
সবিতাদের বাড়িটাকে বলা হতো 'বড় বাড়ি'। সাতজন চাচা, তাঁদের স্ত্রী-সন্তান এবং বৃদ্ধা দাদিকে নিয়ে এক বিশাল সংসার। সবিতার শৈশব কেটেছে এই অগণিত মানুষের ভিড়ে। সেখানে ব্যক্তিগত বলতে কিছু ছিল না; খাবার টেবিল থেকে শুরু করে শোবার ঘর—সবই ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।
সবিতার মনে পড়ে, তার মা আর কাকিমারা সূর্য ওঠার আগে রান্নাঘরে ঢুকতেন আর বের হতেন অনেক রাতে। তাঁদের জীবন ছিল ডাল-ভাতের নুন মাপার মতো হিসেবি। কিন্তু সবিতার চোখ ছিল জানালার বাইরের ওই দিগন্তজোড়া মাঠ আর বকুল গাছটার দিকে। সে স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে যেখানে তার নিজের একটা নাম থাকবে, শুধু 'অমুকের বউ' বা 'তমুকের মা' হয়ে সে জীবন কাটাতে চায় না।
সবিতার বয়স যখন আঠারো, তখন তার বিয়ের কথা উঠল। বাড়ির বড়রা সিদ্ধান্ত নিলেন, পাশের গ্রামের এক শিক্ষিত কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে তার বিয়ে হবে। সবিতা প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, সে কলেজে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু তার দাদি বলেছিলেন, "মেয়েদের অত বিদ্যা দিয়ে কী হবে? হাড়ি ঠেলতে জানলেই হলো।"
বিয়ের পর সবিতা দেখল, বাপের বাড়ির চেয়ে শ্বশুরবাড়ি আরও বেশি কঠোর। সেখানে মহিলারা উঁচু গলায় কথা বলতে পারে না, বিকেলের রোদে বারান্দায় বসতে পারে না। তার স্বামী সুনির্মল মানুষ হিসেবে মন্দ নয়, কিন্তু তার কাছে 'সংসারী স্ত্রী' মানেই হলো নিরবতা। সবিতার ভেতরে থাকা সৃজনশীল সত্তাটা তখন দম বন্ধ হয়ে মরার উপক্রম। সে লুকিয়ে ডায়েরি লিখত, আর মাঝেমধ্যে তার সবজি বাগানে গিয়ে মাটির সাথে কথা বলত।
সবিতার জীবনে পরিবর্তন এল এক বর্ষার দুপুরে। তার ছোট বোন সুমনা, যে যৌথ পরিবারের অবহেলায় চিকিৎসা না পেয়ে ভুগেছিল, সে চিঠিতে তার কষ্টের কথা লিখে পাঠাল। সবিতা উপলব্ধি করল, নারীরা যদি নিজেরা স্বাবলম্বী না হয়, তবে এই অবহেলা কোনোদিন শেষ হবে না।
সবিতা তার জমানো সামান্য কিছু টাকা আর বাপের বাড়ি থেকে আনা কিছু সেলাইয়ের সরঞ্জাম নিয়ে কাজে নামল। প্রথমে শাশুড়ি আর স্বামী খুব বাধা দিলেন। পাড়ার লোকেরা হাসাহাসি করত, "বড় ঘরের বউ এখন দর্জিগিরি করবে?" কিন্তু সবিতা ছিল স্থির। সে গ্রামের আরও কয়েকজন বিধবা আর অসহায় নারীকে সাথে নিল। বাড়ির পেছনের ভাঙা ঘরটাতে শুরু হলো তাদের সেলাই আর কুটির শিল্পের কাজ।
এক সময় বড় ধরনের সংকট এল। সুনির্মলের ব্যবসায় ধস নামল। পুরো পরিবার যখন দিশেহারা, তখন সবিতার জমানো টাকা আর তার ছোট কারখানাটিই ঢাল হয়ে দাঁড়াল। যে শাশুড়ি তাকে কাজ করতে বাধা দিতেন, তিনিই একদিন সবিতার হাতে বাড়ির চাবি তুলে দিলেন। সবিতা প্রমাণ করল যে, নারী শুধু ঘর সামলায় না, সংকটে ঘরের খুঁটিও হতে পারে।
সবিতার সেই ছোট সেলাইয়ের কাজ এখন 'বকুল সমবায়' নামে পরিচিত। গ্রামের প্রায় পঞ্চাশজন নারী সেখানে কাজ করে। সবিতা এখন আর কেবল ঘোমটা টানা বউ নয়, সে ওই এলাকার নারীদের প্রেরণার উৎস।
আজ সবিতার চুলে পাক ধরেছে। সে এখন তার নিজের তৈরি লাইব্রেরিতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার জীবনে কোনো আক্ষেপ নেই। সে তার আত্মজীবনীতে শেষ লাইনে লিখল:
"যৌথ পরিবারের কোলাহলে আমি একদিন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আমি এমন এক আকাশ তৈরি করেছি যেখানে ডানা মেলার অধিকার প্রতিটি নারীর আছে।"
~সমাপ্ত ~

সুন্দর
উত্তরমুছুন