 |
| লেখিকা: নাজমিন আক্তার। |
গল্প: পুরুষের নীরব জীবনের কষ্ট
— নাজমিন আক্তার
- পুরুষ মানুষের জীবন কেনো এমন হয়?
তাদের ও অনেক দুঃখ আছে,কষ্ট আছে; তারাও যে কান্না করতে পারে সেটা কেনো কেউ কখনো ভাবে না?
কথাগুলো রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো রিদুয়ান।
রিদুয়ান একজন প্রবাসী। তার বয়স ২৮ বছর। সে তার পরিবারের সুখের জন্য নিজের মাতৃভূমি কে ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছে!
রিদুয়ান ভাবছে,পরিবারের ভালোর জন্য ছেলেরা কতো কিছুই না সহ্য করে,মানিয়ে নেয়,অল্প বয়সেও অনেকে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নেয়। কেউ কেউ নিজের দেশেই কাজ করে জীবন চালিয়ে নেয় আবার কেউ কেউ পরিবার,ঘর-সংসার সুন্দর মতো পরিচালনা করার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়!
রিদুয়ানের অনেক স্বপ্ন ছিলো। সে খুব পড়াশোনা করবে,নিজের দেশে থেকেই কিছু একটা করবে,কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিলো না। পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন কে মাটি চাপা দিয়ে দূর প্রবাসে পাড়ি দিয়েছে।
হুট করে কথাগুলো মনে পড়ায়,রিদুয়ান একটা নীরব জায়গায় গিয়ে বসলো এবং কথাগুলো একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একাই কথা বলছিলো!
রিদুয়ান যেখানে কাজ করে সেখানে তার কাজের সমস্যা অনেক। ঠিকঠাক মতো বেতন পায় না। তার মাথার উপর অনেক চার। সে নিজে কোনো রকম চললেও;তার পরিবারের কেউ যেনো সমস্যায় না পড়ে সেই দিকে সব সময় নজর রাখবে।
রিদুয়ান সবার চাওয়া-পাওয়ায় দিকে খেয়াল রাখে,সবার শখ পূরণ করায় সব সময় তৎপর থাকে। তবুও কারো মন রাখতে পারে না। সবার যেনো অভিযোগের শেষ নেই;এইটা যে শুধু রিদুয়ানের একার সমস্যা তা নয়,সকল প্রবাসী ছেলেদের একই অবস্থা!
রিদুয়ান মাটিতে বসে মাথা টা নিচের দিকে করে মাটিতে তাকিয়ে বললো____
আমরা পরিবারের থেকে দূরে থাকি,প্রবাসে থাকি বলে কি আমরা আমাদের পরিবারের কাছে পর হয়ে গেলাম? আমাদের কে কি তাদের মনে পড়ে না? প্রয়োজন ছাড়া কেনো খোঁজ-খবর নেয় না? কিভাবে আছি,কি খাচ্ছি,বাসায় যাওয়ার কথাও তো কেউ বলে না!
রিদুয়ান ভেবে পায় না,দুনিয়াতে সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও পুরুষের জীবন কেনো এমন ছন্নছাড়া হয়। পুরুষ মানুষ কেনো মেয়েদের মতো যখন তখন কান্না করে নিজের কষ্ট কে হালকা করতে পারে না?
রিদুয়ান নিজেই নিজেকে উত্তর দিলো_____
পৃথিবীর বুকে পুরুষ মানুষ শুধু একটা কঠিন বস্তুর মতো,আমাদের কান্না করতে যে মানায় না; তাহলে দুনিয়ার মানুষ বুঝে যাবে আমার অপদার্থ, আমরা নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ তাদের সামলাবো কি করে?
আসল পুরুষ কখনো কান্না করে না,করলেও তা লোকসমাজে তা বেমানান তাই দেখানো যাবে না,পুরুষ মানুষ ভিতরে ভিতরে ধ্বংস হলে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেলেও বাহিরে তাকে সর্বদা লোহার মতো অটুট থাকতে হবে; তবেই সে পুরুষ হিসেবে গন্য ধরা হয় লোকসমাজে!
বিয়ের আগে একটা পুরুষ মানুষের জীবন যেমন খুশি কেঁটে গেলোও বিয়ের পরেই শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। যেখানে সে পদে পদে ভুল প্রমাণীত হয়!
বিয়ের পরে দেখা যায় —
মা আর বউয়ের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে সমস্যা হয়,অনেক ঝামেলা হয়। অনেক সময় দেখা যায় মা আর বউ দু'জনের ঝগড়া ও হয়ে যায়। তারা কেউ কাউকে ছাড় দেয় না।
সারাদিন সেই পুরুষ টা যদি কাজ থেকে বাসায় ফিরে ঘরে শান্তি না পেয়ে এমন অশান্তি পায় তাহলে কেমন লাগে? মা আর বউ দু'জনেই ঝামেলা করে,একজন তার স্বামী কে বলে বিচার করতে আরেকজন তার ছেলেকে বলে বিচার করতে!
একটা ছেলের কাছে তার মা এবং বউ দু'জনেই খুব প্রিয় হয়ে থাকে। বউ আর মা তারা একে উপরকে মাঝে মাঝে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করায়,ছেলেটা কার বিচার করবে আর কাকে বেশি ভালোবাসে তা দেখার জন্য!
মা হলো একটা ছেলের আবেগ,ভালোবাসা তার জান্নাত। মায়ের জন্য কিন্তু একটা ছেলে বাবার সাথে ঝগড়া করতে পারে। মা'কে যে ছেলেরা কতোটা ভালোবাসে সেটা যদি তাদের মা'রা বুঝতো তাহলে কোনো মা ছেলে কষ্ট পাবে এমন কোনো কাজ করতে পারতো না। এমনি ছেলের ভালোর জন্য শান্তির জন্য ছেলের বউয়ের সাথেও কখনো ঝামেলা হয়তো করতো না!
স্ত্রী হলো স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী। দুনিয়ার প্রথম সম্পর্কই হলো স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্ক। তারা এক আত্মা দু'টো প্রাণ। বউ কে ছাড়া পুরুষ মানুষের জীবন অপূর্ণ হয়ে থাকে। বউকে একটা পুরুষ তার সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে। যদি বউয়েরা বুঝতো তাদের স্বামী'র কি কষ্ট হয় এইসব ঝামেলা দেখতে,অশান্তি'তে মরে যেতে ইচ্ছে হয়,তাহলে হয়তো বউ হয়ে সে স্বামী'র খুশির জন্য সব মেনে নিয়ে শান্তি বজায় রাখতো আর শাশুড়ী কেও মা মনে করতো!
মা আর বউ মিলেমিশে থাকলে একটা পুরুষের জীবনে যতোই দুঃখ,কষ্ট থাক সে ঠিকই তা পার করে জীবনে সুখী হতে পারবে কিন্তু ঘরে শান্তি না থাকলে বাহিরে কি করে সেই শান্তি মিলবে?
একটা পুরুষ'কে বাহিরে কাজ করতে হয়,কাজের ওইখানে কতো মানুষের কতো রকমের কথা সহ্য করে টাকা উপার্জন করতে হয়,এমনে এমনেই কেউ টাকা দিয়ে দেয় না। পুরুষ মানুষের কাঁধেই সংসারের ভার,সকলের চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ করার ভার থাকে,ভাই-বোনদের বড় করতে হয়,পড়াশোনা করাতে হয়,বিয়ে শাদীর এমন অনেক কিছুই তার মাথায় সব সময় চিন্তা থাকে,মাঝে মাঝে এইসব চিন্তায় সে রাতে ঠিকঠাক ঘুমাতে পর্যন্ত পারে না!
একটা পুরুষ মানুষের দায়িত্ব সব করার সে করেও,কিন্তু তারও তো মন চায় আমাকে কেউ একটু বুঝুক,আমাকেও সবাই ভালোবাসুক,কারণে-অকারণে সবাই আমার খোঁজ করুক।
রিদুয়ানের আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না, তার মাঝে মাঝেই মনে হয় আমি মরে যাই,হয়তো মরে গেলেই সব শান্তি মিলবে।
আমি তো শুধুমাত্র সবার একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম,সবাই আমাকে বুঝবে সে আশা করেছিলাম,আমার বিপদে হাত না ছেড়ে আমার পাশে ভরসার হাত বাড়াবে ভেবেছিলাম; তা আর হলো কোথায়? আমি একাই সব সহ্য করছি করে যাচ্ছি,আমার রাতে ঘুম হয় না,ঠিকঠাক খাওয়া হয় না কতোদিন,মাথা ব্যাথা করে প্রচুর কাজের সমস্যা,পরিবারের দিক দিয়েও শান্তি নেই,নিজেকে খুব অসহায় লাগছে আল্লাহ্!
রিদুয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বললো_____
আমি মরে গেলে আমার ঘর-সংসার,পরিবারের কি হবে?
তাদের দায়িত্ব কে নিবে?
তারা সমাজে কিভাবে বেঁচে থাকবে?
তাদের জন্য হলেও আমাকে বেঁচে থাকতে হবে,বাসায় ফিরে যাই সকালে কাজ করতে যেতে হবে,মেনে নিতে হবে,মানিয়েও নিতে হবে,কান্না আসলেও তা লোকসমাজে দেখানো যাবে না সব সহ্য করে নিতে হবে;কারণ, “এটাই আমাদের পুরুষ মানুষের জীবন!”
______সমাপ্ত______