বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প: নীরব পুরুষ আমি লেখক: হাফেজ মোহাম্মদ সোহেল হাসান। শব্দসাঁকো।


 অনুগল্প: নীরব পুরুষ আমি

লেখক: হাফেজ মোহাম্মদ সোহেল হাসান 


আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। বড় কোনো পরিচয় নেই, বড় কোনো স্বপ্নও না। শুধু ছোট্ট একটা ইচ্ছে ছিল—নিজের একটা সংসার গড়ব, যেখানে আমার মানুষগুলো ভালো থাকবে, শান্তিতে থাকবে।

হয়তো সেই ইচ্ছেটাই আমাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে।


আমার দিনটা শুরু হয় ভোরে। যখন চারপাশে এখনো নীরবতা, তখন আমি চুপচাপ উঠে পড়ি। আয়নায় নিজের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে মনে হয়—এই মানুষটাকে আমি চিনিই না। চোখের নিচে ক্লান্তি, মুখে চাপা দুশ্চিন্তা, তবুও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করি।

কারণ আমি জানি, আমি দুর্বল হলে আমার পরিবার ভেঙে পড়বে।


বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমি প্রতিদিন একটা কাজ করি—চুপচাপ আমার সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেই, আর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। ওরা তখন ঘুমিয়ে থাকে, জানেও না আমি কীভাবে তাদের জন্য প্রতিদিন যুদ্ধ করতে বের হই।

কিন্তু আমি কিছু বলি না। কারণ আমি শিখেছি, পুরুষদের ভালোবাসা মুখে বলতে হয় না—কাজেই প্রমাণ করতে হয়।


সারাদিন আমি বাইরে থাকি। কাজের চাপ, মানুষের কথা, জীবনের হিসাব—সবকিছু একসাথে মাথার ওপর এসে পড়ে। অনেক সময় খুব ক্লান্ত লাগে, মনে হয় একটু বসি, একটু বিশ্রাম নেই।

কিন্তু তখনই মনে পড়ে—আমার থামার সুযোগ নেই।

আমার থেমে যাওয়াটা মানে আমার পরিবারের কষ্ট শুরু হওয়া।


আমি নিজের ইচ্ছাগুলো ধীরে ধীরে মেরে ফেলেছি।

কোনো কিছু ভালো লাগলে কিনতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু ভাবি এই টাকা দিয়ে বাসার বাজার হবে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চলবে।

নিজের শখ, নিজের স্বপ্ন—সবকিছু এক পাশে সরিয়ে রেখে আমি শুধু একটা কথাই ভাবি,আমার পরিবার যেন ভালো থাকে।


বাড়ি ফিরি রাতে। শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে। কিন্তু বাসার দরজা খুলে যখন ভেতরে ঢুকি, তখন মুখে একটা হাসি রাখি।

কারণ আমি চাই না, আমার ক্লান্তি দেখে কেউ চিন্তা করুক।


আমার স্ত্রী কখনো কখনো বলে, তুমি তো আমাদের সময় দাও না। সারাদিন বাইরে থাকো।


কথাটা শুনে আমি চুপ হয়ে যাই।

ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করে—

বলতে ইচ্ছে করে, এই বাইরে থাকাটাই তো তোমাদের জন্য।

কিন্তু আমি কিছুই বলি না।

কারণ আমি জানি, আমার ব্যাখ্যা হয়তো তার কাছে অজুহাত মনে হবে।


আমি বুঝি, আমি হয়তো ঠিকভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না।

আমি “ভালোবাসি” কথাটা সহজে বলতে পারি না।

আমি শুধু চেষ্টা করি, যেন কোনো অভাব না থাকে।


কিন্তু মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়।

যখন দেখি, আমার এত চেষ্টা, এত ত্যাগ–কেউ যেন বুঝতেই চায় না।

আমি চুপচাপ থাকি বলে, সবাই ভাবে আমার কোনো অনুভূতি নেই।


একদিন রাতে আমার ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল,

আব্বু, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?


আমি একটু হেসে বললাম,তোমার জন্যই তো সব করি।


সে হয়তো বুঝতে পারেনি আমার কথার গভীরতা।

কিন্তু আমি জানি, আমার প্রতিটা ঘাম, প্রতিটা কষ্ট—সবই ওর জন্য।


আমি কখনো কাউকে দোষ দেই না।

হয়তো আমারই ভুল,আমি আমার কষ্টগুলো কাউকে বুঝাতে পারি না।

আমি শুধু চুপচাপ দায়িত্ব পালন করে যাই।


রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমি একা বসে থাকি।

ভাবি,আমি কি সত্যিই অবহেলিত?

নাকি এটাই একজন পুরুষের জীবন?


হয়তো পুরুষ হওয়া মানেই,নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখা।

হয়তো পুরুষ হওয়া মানেই,চুপচাপ সব সহ্য করা।

হয়তো পুরুষ হওয়া মানেই,নিজে কষ্ট পেয়ে অন্যদের হাসি দেখানো।


আমি জানি না, আমার এই গল্প কেউ বুঝবে কিনা।

কিন্তু আমি এটুকু জানি,আমি খারাপ কিছু চাইনি।

আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমার পরিবার ভালো থাকুক।


আজও আমি ভোরে উঠব, আবার কাজে যাব, আবার একইভাবে লড়াই করব।

কারণ আমি থামতে পারি না।

আমি হার মানতে পারি না।


আমি একজন পুরুষ,

আমার ভালোবাসা শব্দে না, দায়িত্বে লেখা।

আমার কষ্ট চোখে না, নীরবতায় লুকানো।

আর আমার গল্প—হয়তো কখনো পুরোটা কেউ বুঝবে না…।


~~~সমাপ্ত~~~

পোস্টটি শেয়ার করুন:

0 Please Share a Your Opinion.: