শিরোনাম: বউয়ের হাতে বাথরুমের চাবি
লেখক: সাদ্দাম সমাদ্দার
গল্পের চরিত্রসমূহ:
১. মোবারক সাহেব: বাড়ির কর্তা, যিনি বাথরুমের চাবি হারিয়ে চরম বিপাকে।
২. জরিণা বেগম: মোবারক সাহেবের স্ত্রী, অত্যন্ত কড়া মেজাজের এবং বর্তমানে চাবির একমাত্র মালিক।
৩. বল্টু: মোবারক সাহেবের ফাঁকিবাজ ছোট ছেলে, যে সবকিছুর মধ্যে সুযোগ খোঁজে।
৪. পিঙ্কি: বড় মেয়ে, যে সারাক্ষণ সেলফি আর মেকআপ নিয়ে ব্যস্ত।
৫. মকবুল চাচা: পাশের বাড়ির কৌতূহলী প্রতিবেশী, যিনি বিনা আমন্ত্রণে সবখানে নাক গলান।
৬. কদম আলী: বাড়ির কাজের লোক, যে একটু কানে কম শোনে এবং অদ্ভুত সব কাণ্ড করে।
মূল গল্প:
ভোর ছয়টা। মোবারক সাহেবের ঘুম ভাঙল এক অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে। পেটের ভেতর যেন একঝাঁক ড্রামিবাদক তবলার রিদমে প্র্যাকটিস শুরু করেছে। মোবারক সাহেব দ্রুত বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হ্যান্ডেল ঘোরালেন, কিন্তু দরজা খুলল না। ধাক্কা দিলেন, কাজ হলো না। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলেন—দরজায় একটা বড়সড় চায়না তালা ঝুলছে!
মোবারক সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, "ওগো শুনছ, বাথরুমে তালা কেন? চাবি কোথায়?"
রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এলেন জরিণা বেগম। শান্ত গলায় বললেন, "চাবি আমার আঁচলে। আজ থেকে এই বাড়িতে বাথরুম ব্যবহার করতে হলে পারমিশন লাগবে। নিয়ম জারি করেছি।"
মোবারক সাহেব কপাল চাপড়ে বললেন, "নিয়ম মানে? আরে বাবা, এটা কি রেশন অফিস নাকি? আমার খুব ইমার্জেন্সি, চাবিটা দাও!"
জরিণা বেগম সোফায় গিয়ে আয়েশ করে বসলেন। "কাল রাতে তুমি বলেছিলে আমার হাতের রান্না নাকি লবনাক্ত হয়েছে? আজ সেই লবণের শোধ নেব। আগে মাফ চাও, তারপর চাবি।"
ঠিক এই সময়ে সেখানে হাজির হলো বল্টু। বল্টুর হাতে একটা খাতা আর কলম। সে ফিসফিস করে বাবার কানে বলল, "আব্বা, আম্মার সাথে ডিল করে লাভ নাই। আমার কাছে একটা অফার আছে। আমি জানি পাশের গলির পাবলিক টয়লেটের চাবি কার কাছে। মাত্র ৫০০ টাকা দিলেই ব্যবস্থা করে দেব।"
মোবারক সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন, "হারামজাদা! বাপের বিপদে তুই ব্যবসা খুঁজছিস? যা এখান থেকে!"
এদিকে বড় মেয়ে পিঙ্কি তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পরনে সিল্কের গাউন, হাতে আইফোন। সে বাথরুমের তালার সামনে দাঁড়িয়ে একটা করুণ মুখ করে সেলফি তুলল। ক্যাপশন দিল— "Home Sweet Home, But Bathroom is Blocked! Feeling Constipated with 44 others."
মোবারক সাহেব এবার সত্যি সত্যি কাঁদতে বাকি রাখলেন। পেটের ঢাক-ঢোল এখন রীতিমতো অর্কেস্ট্রার রূপ নিয়েছে। তিনি মরিয়া হয়ে কদম আলীকে ডাকলেন। "কদম! ওরে কদম! একটা হাতুড়ি নিয়ে আয় তো, এই তালাটা ভাঙতে হবে।"
কদম আলী এক গাল হাসি নিয়ে এল। "কী বললেন খালুজান? আম পাড়তে হবে? এই সাত সকালে আম কই পাব?"
"আরে গাধা! আম না, তালা! তালা ভাঙবি!" মোবারক সাহেব চিল চিৎকার দিলেন।
কদম আলী মাথা চুলকে বলল, "ও আচ্ছা, থালা ধুতে হবে? ঠিক আছে, নিয়ে আসছি সাবান।" সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
এরই মধ্যে ড্রয়িংরুমের জানলা দিয়ে উঁকি দিলেন প্রতিবেশী মকবুল চাচা। মকবুল চাচার কাজই হলো মানুষের বিপদে জ্ঞান দেওয়া। তিনি বললেন, "মোবারক ভাই, ঘটনা কী? বাথরুমের সামনে এত জটলা কেন? আন্দোলন হচ্ছে নাকি?"
মোবারক সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "মকবুল ভাই, জানলাটা বন্ধ করেন তো! পেটের ব্যথায় জীবন যায় আর আপনি আসছেন ইন্টারভিউ নিতে!"
মকবুল চাচা দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বললেন, "শুনেন ভাই, আমার এক মামাতো ভাই আছে তালা বিশেষজ্ঞ। তবে সে এখন জেলে। আপনি বরং এক কাজ করেন, লেবুর শরবত খান। পেটের চাপ কমবে।"
মোবারক সাহেব রাগে ফেটে পড়লেন। "লেবুর শরবত খেলে চাপ কমবে না বাড়বে রে ভাই? আপনারা কি আমাকে মারতে চান?"
জরিণা বেগম এবার ড্রয়িংরুম থেকে ঘোষণা করলেন, "চাবি পেতে হলে শর্ত নম্বর দুই—আগামী এক মাস বাজারের ব্যাগ আমি চেক করব। কোনো লুকানো বিড়ি বা জর্দা পাওয়া গেলে বাথরুম চিরস্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া হবে!"
মোবারক সাহেব নিরুপায় হয়ে সোফায় ধপাস করে বসে পড়লেন। পেটের ভেতর তখন যুদ্ধংদেহী অবস্থা। তিনি বল্টুকে ডাকলেন, "বল্টু বাবা, তোর অফারটা এখনো আছে? কত বললি যেন?"
বল্টু দাত বের করে হাসল। "এখন তো ডিমান্ড বেড়ে গেছে আব্বা। এখন ১০০০ টাকা। সাথে এক প্যাকেট চকোলেট।"
মোবারক সাহেব পকেট থেকে ১০০০ টাকার নোট বের করতে যাবেন, এমন সময় কদম আলী এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলো। সে ভাবল বাথরুমে পানি নেই বলে খালুজান চিৎকার করছেন। সে বিনা নোটিশে বাথরুমের দরজার ওপর ঢক ঢক করে পানি ঢালতে শুরু করল।
"আরে থাম! থাম!" মোবারক সাহেব কদমকে বাধা দিতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেলেন মেঝেতে। পিঙ্কি সেই মুহূর্তটা ভিডিও করে ফেলল। "Breaking News: Dad's Epic Fall for Bathroom Key! #ViralVideo #FamilyDrama."
ঠিক তখন বাড়ির ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল। জরিণা বেগম ফোন ধরলেন। ওপাশ থেকে মোবারক সাহেবের শাশুড়ি ফোন করেছেন। জরিণা বেগম ফোনে বলতে লাগলেন, "মা, তোমার জামাইকে আজ টাইট দিচ্ছি। সারা জীবন আমার ওপর হুকুম চালিয়েছে, আজ বুঝুক চাবি কার হাতে!"
মোবারক সাহেব এবার হামাগুড়ি দিয়ে জরিণা বেগমের পা ধরতে গেলেন। "ওগো, তুমি যা বলবে তাই শুনব। বাজার আমিই করব, ঘর আমিই মুছব। এমনকি তোমার সিরিয়াল দেখার সময় রিমোটও ধরব না। দয়া করে চাবিটা দাও, আমার নাড়িভুঁড়ি সব এক হয়ে যাচ্ছে!"
জরিণা বেগমের মন একটু গলল। তিনি আঁচল থেকে চাবিটা বের করে মোবারক সাহেবের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। মোবারক সাহেব যেন অলিম্পিকের ১০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়েছেন! তিনি লাফ দিয়ে চাবিটা ধরলেন এবং তালার ফুটোয় ঢোকালেন।
কিন্তু কপাল খারাপ! চাবি ঘুরছে না। মোবারক সাহেব ঘামতে ঘামতে বললেন, "জরিণা, চাবি তো ঘোরে না! এটা কিসের চাবি?"
জরিণা বেগম চাবির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। "ওমা! এটা তো আমার আলমারির চাবি! বাথরুমের চাবি তো মনে হয় ডাইনিং টেবিলের ওপর ফেলে এসেছি!"
মোবারক সাহেবের মুখ তখন নীল হয়ে গেছে। তিনি ডাইনিং টেবিলের দিকে দৌড় দিলেন। কিন্তু সেখানে চাবি নেই। বল্টু তখন এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসছে। তার হাতে আসল চাবি। বল্টু বলল, "আব্বা, ১০০০ টাকা তো দিলে না। চাবিটা কিন্তু আমার কাছেই ছিল।"
মোবারক সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি বল্টুর হাত থেকে চাবিটা একরকম ছিনিয়ে নিলেন। এবার তালা খুলল। মোবারক সাহেব ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাইরে থেকে শোনা গেল তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
বাইরে তখন মকবুল চাচা চেঁচিয়ে বলছেন, "মোবারক ভাই, সাকসেস? অভিনন্দন! মিষ্টি খাওয়ান!"
পিঙ্কি লাইভে এসে বলছে, "Guys, finally the mission is accomplished! My dad is now officially in the bathroom. Stay tuned for more updates."
আধা ঘণ্টা পর মোবারক সাহেব যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তার চেহারায় তখন পৃথিবীর সমস্ত প্রশান্তি। তিনি জরিণা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "জরিণা, শোনো। আজ থেকে এই বাড়িতে ডেমোক্রেসি চলবে। বাথরুমের চাবি কেউ নিজের কাছে রাখবে না। ওটা দরজাতেই থাকবে।"
কদম আলী তখন এক প্লেট মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকল। "খালুজান, আপনি বাথরুম থেকে বের হয়েছেন খুশিতে পাশের বাসার ভাবি মিষ্টি পাঠিয়েছে।"
মোবারক সাহেব একটা মিষ্টি মুখে দিয়ে বললেন, "এই শহরে একটা কথা প্রচলিত আছে—বউয়ের মন আর বাথরুমের চাবি, এই দুইটা যার হাতে থাকে, সেই আসল রাজা!"
পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। শুধু পিঙ্কি বিরস মুখে বলল, "ধুত্তোর! এত সুন্দর ড্রামাটা শেষ হয়ে গেল? আমার ফলোয়াররা তো আরও অ্যাকশন চাইছিল!"
বল্টু পকেটে ১০০০ টাকা গুঁজে মিটিমিটি হাসতে হাসতে নিজের ঘরে চলে গেল। আর মোবারক সাহেব ঠিক করলেন, আজ বিকেলেই তিনি বাথরুমের দরজায় একটা অটোমেটিক লক লাগিয়ে নেবেন, যার কোনো চাবিই থাকবে না!
সমাপ্ত
